Wednesday, January 9, 2019
Home > আন্তর্জাতিক > পুরোনো রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে চায়

পুরোনো রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে চায়

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং নিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরে ঢোকার মুখেই রাস্তার দুই ধারে ছোট ছোট দোকানপাট। তার একটিতে প্রতিদিন শুধু শরণার্থী শিবিরের পুরুষদের জন্য জোব্বা বানান মো. সেলিম। ক্যাম্পজীবনের একঘেয়ে এই কাজ আর ভালো লাগে না তাঁর। মনে আশা, মেয়েটিকে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ বানাবেন। বাংলাদেশে সপ্তম শ্রেণির পর লেখাপড়ার সুযোগ নেই রোহিঙ্গাদের। তিনি সন্তানের জন্য হলেও শরনার্থী জীবনের অবসান চান।

সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রাণ নিয়ে বহু মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। কক্সবাজারের পুরোনো শিবিরে আত্মীয়স্বজনর সঙ্গে এসে উঠেছে নতুনেরা। ভবিষ্যৎ ভাবনা কী পুরোনো শরণার্থীদের? জানতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর কথা হয় কুতুপালং শিবিরের কয়েকজনের সঙ্গে।

তখন সন্ধ্যা। কুতুপালংয়ে কেউ কেউ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও সবার ঘরে সেই ব্যবস্থা নেই। তাই দোকানপাটের আলোয় বড়রা আড্ডা বসিয়েছিলেন, শিশুরাও ঘুরছিল বাজারে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। শরণার্থী শিবিরে পানির সংকট, পয়োব্যবস্থাও যথেষ্ট খারাপ। মানুষ বেশি, জোগান কম—এই যুক্তিতে পান-সুপারি থেকে শুরু করে শিবিরের ভেতরেই সব জিনিসের দাম বেড়েছে। একদিকে জিনিসের দাম বেশি, অন্যদিকে পুরোনো হওয়ায় ত্রাণ পাচ্ছে না। সব মিলে পুরোনোরাও চাপে রয়েছেন।

কুতুপালং শরণার্থী বাজারে মো. সেলিমের সঙ্গে কথা বলার সময় ঘিরে ধরেছিলেন জনা ত্রিশেক লোক। সবাই পুরোনো। তাঁরা ‘ঝামেলা’য় ভরা এই জীবন থেকে মুক্তি চান। তাঁদের একজন আমানুল্লা। তিন বছর বয়সে পাহাড়-জঙ্গল ডিঙিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন। মিয়ানমারের দোতলা কাঠের বাড়ির গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন। পলিথিনের ছাদ আর মাটির ওপর চাটাইয়ে শুয়ে শুয়ে তিনিও স্বপ্ন দেখছিলেন ফিরে যাওয়ার। এর মধ্যেই তাঁর স্বজনেরা মিয়ানমারের জঙ্গল থেকে ফোন করে জানান, তাঁরা আশ্রয় চান। তিনি ‘না’ করতে পারেননি। শরণার্থী শিবিরে তাঁর ২২৫ বর্গফুটের কক্ষে এখন তিনি, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান ছাড়া আরও ছয়জন এসে উঠেছেন। তারপরও বাড়ি ফিরতে চান।

কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত শিবির, লেদার অনিবন্ধিত শিবিরের পুরোনো রোহিঙ্গারা কেন দেশে ফিরতে চায়—এমন প্রশ্নের জবাবে মোটের ওপর এই উত্তরগুলো পাওয়া গেছে, শরণার্থী বলে তারা স্বাধীনভাবে কাজকর্ম, চলাফেরা করতে পারে না। প্রতি মাসে ৮৫২ টাকার রেশন কার্ড পায়। তা দিয়ে চাল, ডাল, সয়াবিন তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনতে পারে তারা। শরণার্থী শিবিরে ইদানীং স্কুল চালু হয়েছে। কিন্তু সপ্তম শ্রেণির পর পড়ালেখার ব্যবস্থা নেই। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা দরজি, ছুতোর, সাবান তৈরি, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি, রিকশা ও বাইসাইকেল মেরামতের কাজ শেখায়। তবে তাদের কাজ করতে হয় শিবিরের ভেতরে। নিয়ম না মেনে অনেকেই বাইরে কাজ করে। তবে সেটা করতে হয় একরকম চুরি করে। স্থানীয় বাসিন্দারাও এ নিয়ে কথা শোনান। রোহিঙ্গাদের কারণে তাঁদের কাজের সুযোগ কমে আসছে বলে ক্ষিপ্ত তাঁরা।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) বলছে, এই দফায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ লাখ ৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

যুগে যুগে রোহিঙ্গারা আসছেই

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, দুবার মিয়ানমারকে শরণার্থী প্রত্যাবাসনে রাজি করানো সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের ৭ থেকে ৯ জুলাই ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার ও বার্মা সরকারের মধ্যে আলোচনা হয়। ওই আলোচনার প্রথম ও প্রধান অ্যাজেন্ডা ছিল বার্মার নাগরিকদের প্রত্যাবাসন। বার্মা সরকার সে সময় তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। ওই বছরের ৩১ আগস্ট থেকে পরের ছয় মাসে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সে সময় শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ১ লাখ ৮০ হাজার বর্মি নাগরিক ফিরে যায়। ১৯৯১ সালে আবারও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

১৯৯১-৯২ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন। ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে ফিরিয়ে নেয় মিয়ানমার সরকার। কিন্তু ২০০৫ সালের পর থেকে প্রত্যাবাসন একরকম বন্ধ হয়ে যায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের নিজস্ব রেকর্ড বলছে, গত ২৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবানে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৬০৯ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল।

তবু আশা

টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরের ‘সেক্রেটারি’ আমির আহমাদ। তিনি বলছিলেন, রোহিঙ্গাদের অনেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, বিদেশেও গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরিও করছে বাংলাদেশি পরিচয়ে। তিনি এমন লুকোচুরি করে নাগরিকত্ব নিতে চান না। তিনি মিয়ানমারে মাথা উঁচু করে নাগরিকত্ব নিয়ে ফিরতে চান। তিনি শিবিরের মানুষকে সচেতন করছেন বলেও জানান। আমির বলছিলেন ‘আরসা বলেন বা হারাক্বা আল ইয়াক্বিন বলেন, আমাদের কোনোভাবেই কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া ঠিক হবে না। আমাদের পরিবারগুলো দেখেন। একেকটা পরিবারে সদস্য সাতজন। এত বলি, এটা আমাদের দেশ না। ছোট পরিবার নিয়ে যাওয়া সহজ হবে। কেউ কথা শোনে না।’ এত এত মানুষকে কি মিয়ানমার সরকার গ্রহণ করবে, নতুন করে কোনো শর্ত জুড়বে না তো—এমন হাজারো চিন্তা তাঁর মাথায় ঘোরে। কবে যাবেন বলে আশা করেন—এমন প্রশ্নে অবশ্য নিরুত্তরই থাকলেন আমির।

%d bloggers like this: