Wednesday, December 12, 2018
Home > অফিস আদালত > প্রধান বিচারপতির স্বপ্রণোদিত পদত্যাগ চায় সরকার

প্রধান বিচারপতির স্বপ্রণোদিত পদত্যাগ চায় সরকার

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণে সংসদ, শাসন ব্যবস্থাসহ নানা বিষয়ে বিরূপ মন্তব্যের জেরে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার স্বপ্রণোদিত পদত্যাগ চায় সরকার। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন,‘প্রধান বিচারপতির স্বপ্রণোদিত পদত্যাগের সিদ্ধান্তই পারে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ইস্যুতে চলমান বিতর্কের অবসান ঘটাতে।’

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করেন তথ্যমন্ত্রী। নানা ইস্যুতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে এমন সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারক অপসারণক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে এসে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সরকার। এটি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নামে পরিচত। কিন্তু পরের বছর হাইকোর্ট এই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আর এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল গত ৩ জুলাই খারিজ করে প্রধান বিচারপতিসহ সাত বিচারকের আপিল বিভাগ।

১ আগস্ট এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। এতে ৯৬ অনুচ্ছেদের বাইরে গিয়ে শাসন সংসদ, আইন প্রণয়ন পদ্ধতি, সংসদের নারী আসনে নির্বাচন। বিশেষ করে সংসদ অকার্যকর, অপরিপক্ক-এমন মন্তব্য ক্ষুব্ধ করে তুলেছে সরকারকে। আবার এই রায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অবমাননার অভিযোগও এনেছে সরকারি দল।

এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রিসভার সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতা এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে।

ষোড়শ সংশোধনীর মামলার রায় ছাড়াও অধঃস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির বিধিমালা সংক্রান্ত শুনানিতে প্রধান বিচারপতির পাকিস্তান সংক্রান্ত উদাহরণেও ক্ষিপ্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানে অযোগ্য ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন নওয়াজ শরিফ।

সেই কথা তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে ইয়ে (অযোগ্য) করল। সেখানে কিছুই (আলোচনা-সমালোচনা) হয়নি। আমাদের আরও পরিপক্কতা দরকার।’

আর গত ২১ আগস্ট এই বক্তব্যের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা… সব সহ্য করা যায়, কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা সহ্য করব না।’

প্রধান বিচারপতির ওই বক্তব্যকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘ওই হুমকি আমাকে দিয়ে লাভ নাই’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আইয়ুব খান দেখেছি, ইয়াহিয়া খান দেখেছি, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া…’

প্রধান বিচারপতির চাকরির মেয়াদ আছে ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর তার অবস্থান কী হবে-সে বিষয়ে সচিবালয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়। এর মধ্যেই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানাতে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন তথ্যমন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে বে বক্তব্য দিয়েছেন তা শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নয়, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিক নেতৃত্বকে বিতর্কিত করেছে এবং সামরিক শাসনের জঞ্জালকে পুনরায় টেনে আনার অপপ্রয়াসমূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বিদ্বেষমূলক।’

ষোড়শ সংশোধনীর এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকও। গত ২০ আগস্ট রাজধানীতে এক আলোচনায় তিনি এই রায় বিরাগ থেকে দেয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শও দেন।

খায়রুল হক বলেন, ‘আমরা জজ সাহেবেরা কোনোদিনই অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু করব না। রায়ে যদি কোনো অনুরাগ বা বিরাগ রিফ্লেক্ট করে, তাহলে হোয়াট ইজ দ্য কনসিকোয়েন্স অব দ্যাট জাজমেন্ট। থিঙ্ক অ্যাবাউট ইট। আমার বলার কিছু নেই।

‘যে জজসাহেব অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে… যদি আপনারা অনুরাগ বা বিরাগ বলে মনে করেন আপনারা… যেগুলো আমি বললাম, ‘পার্লামেন্ট ইজ ইমম্যাচিউরড’, ‘ডেমোক্রেসি ইজ ইমম্যাচিউরড’, ‘পার্লামেন্ট আমাদের ডাইরেকশন শোনেনি’, এই কথাগুলো যদি অনুরাগ বিরাগের মধ্যে চলে আসে তাহলে সেই জজ সাহেবের পজিশনটাই বা কী হবে?’।

অনুরাগ বা বিরাগ থেকে রায় দেয়া হলে তা শপথ ভঙ্গের শামিল হয়। এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি শপথ ভঙ্গ করেছেন কিনা তাও বিচার্য। বিচারপতি যেখানে নিজেই অনভিপ্রেত মন্তব্য করে বিতর্কের সূচনা করে জনমনে নিজেকে এবং বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিকে একটি বিতর্কিত অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এ ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তিনি নিজেই স্বত:প্রণোদিত হয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের অবসান ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখবেন কিনা তাকে তা ভেবে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ না করলে কী হবে-জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারেন।’

%d bloggers like this: