বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ থেকে বাদ মিলন

বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ থেকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে। দলের এই সিদ্ধান্ত ‘সঠিক’ বলে মানছেন তৃণমূলে জনপ্রিয় এই নেতা। বলছেন, ‘দলের সিদ্ধান্তকে মোস্ট ওয়েলকাম জানাচ্ছি। এখন অনেকটা হালকাবোধ করছি।’

মঙ্গলবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তাকে আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে নির্বাহী কমিটি সদস্য করার কথা জানানো হয়। শুরুতে বিষয়টি আলোচনায় না এলেও বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশের পর এ নিয়ে বিএনপির ভেতরে বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

পরে  প্রতিক্রিয়ায় সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি দলের নীতিনির্ধারকরা রাজনীতিতে পিএইচডিধারী। তাই তারা রেকর্ড যাচাই করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা সঠিক। ব্যর্থতার গ্লানি মেনে নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এখন অনেকটা হালকাবোধ করছি।’

ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন এহসানুল হক মিলন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তিতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের। সেই থেকে চলছিল এতদিন। মাঝে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী থাকাবস্থায় নকলবিরোধী অভিযান চালিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে দেন তিনি। তবে হঠাৎ দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তাকে সম্পাদকীয় পদ থেকে পদাবনতি দিয়ে বিএনপির নির্বাহী কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে যে চিঠিতে এমন সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে তাতে কারো নির্দেশ বা অনুমোদনের কথা উল্লেখ নেই। যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো পদে কাউকে যুক্ত করা বা বাদ দেয়ার চিঠিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের নির্দেশ বা অনুমোদনের কথা উল্লেখ থাকে।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় একজন সহ-সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বিএনপিতে এখন কে কোন পদ পায়, কখন পদ হারায় বোঝা মুশকিল হয়ে গেছে। একটা শৃঙ্খলায় আনা উচিত।’

পদাবনতির চিঠিতে কোনো কারণ উল্লেখ না করা হলেও দলীয় সূত্র বলছে, এহসানুল হক মিলন দীর্ঘদিন ধরে দলের কার্যক্রমে ‘নিষ্ক্রিয়’ থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এরআগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকেও মনোনয়নবঞ্চিত হন তিনি। এরপর থেকেই দলের হাইকমান্ডের সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে আলোচনা আছে।

ওই নির্বাচনে মিলনের আসনে (চাঁদপুর-১) বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি মোশারফ হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়ায় নেতাকর্মীরা ক্ষোভ জানিয়েছিলেন। তখন নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মূল ফটকে তালাও ঝুলিয়ে দেন মিলনের সমর্থকরা।

মিলনকে সম্পাদকীয় পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পেছনে এটিও কারণ হিসেবে দেখছেন বিএনপির কেউ কেউ।

অবশ্য গত নির্বাচনের আগে কারাগারেও যেতে হয়েছিল মিলনকে। সে দফায় তাকে দুইমাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল। এরআগে ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হয়ে হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর কারাবাস করতে হয়েছিল বিএনপির এই নির্বাহী কমিটির সদস্যকে।

এদিকে মিলনকে সরিয়ে দেয়ার দিনেই অন্য এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য আহমেদ আলী মুকিবকে (সৌদি আরব) বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক করার কথা বলা হয়। আর বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ রাশেদুল হককে (অস্ট্রেলিয়া) জাতীয় নির্বাহী কমিটিরসহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে মনোনীত করার কথা জানানো হয়। মিলনের জায়গায় স্থান পাওয়া মুকিব সম্পদশালী নেতা হিসেবে বিএনপিতে পরিচিত। দীর্ঘদিন তিনি মধ্যপ্রাচ্য বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

এহসানুল হক মিলনের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট থাকলেও তিনি তা স্যারেন্ডার করেছেন। ভিসা পেতেও জটিলতা আছে তার। ফলে আন্তর্জাতিক লবিতে কাজ করার সুযোগ কমে আসছে। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে চলমান ৩০টির বেশি মামলার বিচারকাজ চলছে। একাধিক মামলায় যে কোনো সময় রায়ও হয়ে যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার ভিসা পাচ্ছি না। যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আছে। দল হয়তো মনে করেছে যারা বাইরে আছেন তাদের কাজ করার সুযোগ বেশি।’

গত নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়া নিয়ে মিলন বলেন, ‘রাজনীতি করতে টাকার প্রয়োজন আছে। কচুয়াতে আমার সময় যে উন্নয়ন হয়েছে সেখানকার মানুষ সে পরিমাণ ভালোবাসাও দিয়েছে। এখন নির্বাচনে মনোনয়নের খাতা যাচাই করে দল হয়তো মনে করেছে আমি ব্যর্থ। তাই হয়তো মনোনয়ন পাইনি। যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল তিনি এলাকায় না থাকলেও তার অনেক টাকা আছে এটা অস্বীকার করা যাবে না।’

মাঝে বিদেশে থাকাবস্থায় উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এহসানুল হক মিলন। ২০১৮সালে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ‘বাংলাদেশে মানবসম্পদ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা’ নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

এছাড়াও অবসরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে সাতটি বই প্রকাশ করেছেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী।