‘ক্ষমতার মধু’ খেতে উড়ে এসে জুড়ে বসা ভুঁইফোড় সংগঠক

ফের আলোচনায় আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ ও ভুঁইফোড় সংগঠনের বিষয়টি। অনেক চেষ্টা করেও দলটিতে সাহেদ করিম-শামীমা নূর পাপিয়া-হেলেনা জাহাঙ্গীরদের মতো সুবিধাবাদীদের উত্থান থামানো যাচ্ছে না। দিন দিন এ নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক। কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, অস্বীকৃত সংগঠন ও কিছু নেতার ওপর দায় চাপিয়ে ক্ষ্যান্ত অনেকে। আবার অনেকে ঢালাও দায় চাপানোর বিরুদ্ধেও। এ বিতর্কের সমাধানও সহজ নয় বলে মনে করেন ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা।

তারা বলছেন, অনেকেই দল ও দেশকে ভালোবেসেই সংগঠন করেন। মূল দলে জায়গা না পাওয়ায় হয়তো নতুন সংগঠন করেছেন। অনেকে আবার দল ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজি-প্রতারণা-দখলবাজিতে ব্যস্ত। গণতান্ত্রিক দেশে এটির সমাধান সহজ নয়। দেখে-শুনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ১৩/১৪টা সংগঠন স্বীকৃত। এর বাইরে সব ৩০/৪০/৫০ যত সংগঠনই আছে, সব ভুয়া 

একটি অংশের দাবি, ‘ক্ষমতার মধু’ খেতে উড়ে এসে জুড়ে বসা লোকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন দলীয় নেতারাই। আবার ‘প্রয়োজন ফুরালে’ দায়িত্বও এড়িয়ে যান তারা।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে ৭৩টি ভুঁইফোড় সংগঠনের তালিকা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি এসব সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে যারা নানা অপকর্ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, গঠনতন্ত্র ঘোষিত সংগঠনের বাইরে আওয়ামী লীগের কোনো সংগঠন নেই। ‘লীগ’ বা ‘আওয়ামী’ শব্দ যোগ করলেই আওয়ামী লীগের সংগঠন হওয়া যায় না। হওয়ার সুযোগও নেই।

গঠনতন্ত্র অঘোষিত কয়েকটি সংগঠনের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের বাইরে দুই ধরনের সংগঠন আছে। কারও সরকারি নিবন্ধন আছে, কারও নেই। এর মধ্যে একটি পক্ষ যেমন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আদর্শিক কাজে ব্যস্ত থাকে, তেমনি বিরোধী দলে থাকাকালেও রাজপথে সক্রিয় থাকে। আরেকটি পক্ষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সক্রিয় হয়ে চাঁদাবাজি, তদবিরবাজি এবং প্রতারণায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেও প্রতিকূল সময়ে হারিয়ে যায়। এই দুই শ্রেণিকে এক করলে আদর্শিক শ্রেণির ওপর অন্যায় হবে।

 আওয়ামী লীগ জাতীয় আস্থার প্লাটফর্ম। প্রথাগত রাজনৈতিক কর্মীর পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকের আওয়ামী লীগ সমর্থন করার, সদস্য হওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার সময় ভালো মানুষের পাশাপাশি কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এটিই বড় সমস্যা। এ সুযোগসন্ধানীরা আমাদের কারও কারও দ্বারা লালিত হচ্ছে। তারা গুটিকয়েক ব্যক্তি মিলে নানা ধরনের কর্মসূচির আয়োজন করেন এবং সেসব কর্মসূচিতে সরল বিশ্বাসে আমাদের কিছু প্রচারপ্রিয় নেতা অংশ নিয়ে এসব ধান্ধাবাজকে সামাজিক ও দলীয় স্বীকৃতি দিচ্ছেন 

আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সক্রিয় ছিল, এমন কিছু সংগঠনের একাধিক নেতা বলছেন, ‘বিরোধী দলে থাকাকালে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে আমরাই ছিলাম মাঠে। সেসময় দলের সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ মূল দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতারা এসেছেন আমাদের প্রোগ্রামে। বাহবাও দিয়েছেন। দল ক্ষমতায় যাওয়ায় আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এখন আমাদের ছুড়ে ফেলে দেয়।’

আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদ এবং শামীমা নূর পাপিয়াসহ কতিপয় লোকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। সম্প্রতি ‘চাকুরিজীবী লীগ’ নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের প্রচারণায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীরের সরব হওয়া নিয়ে সমালোচনা ওঠে। পরে তাকে উপ-কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর র্যাব হেলেনার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হয়।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই নড়েচড়ে বসেছে আওয়ামী লীগ। ৭৩টি ভুঁইফোড় সংগঠনের নামের তালিকা করার পর তাদের কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে যারা নানা অপকর্ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

jagonews24আওয়ামী লীগের সুসময়ের পাশাপাশি দুঃসময়েও রাজপথে সক্রিয় থেকেছে অনেক সংগঠন। তাদের কর্মসূচির খবর প্রচার হয়েছে অনেক পত্রপত্রিকায়। ছবি: সংগৃহীত

 আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করি, কিন্তু গঠনতন্ত্র স্বীকৃত নয়, এটা ঠিক। আমাদের সরকারের রেজিস্ট্রেশন আছে। অনেক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশনও নেই, দলেরও স্বীকৃতি নেই। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় ধরা কে সরা জ্ঞান করে। সাইনবোর্ড দেখিয়ে তদবির-প্রতারণা করে টাকা কামাচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলে গেলে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা সরকারে ও বিরোধী দলে উভয় সময়ে সরব থাকি। ওদের সঙ্গে আমাদের তুলনা করলে, আমাদের ওপর অবিচার হবে 

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান  বলেন, ‘আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ১৩/১৪টা সংগঠন স্বীকৃত। এর বাইরে সব ৩০/৪০/৫০ যত সংগঠনই আছে, সব ভুয়া।’

স্বীকৃতদের বাইরে অনেকে সরকারে ও বিরোধী দলে থাকাকালে আন্দোলন করেছেন, তাদের দাবি, সুসময়ে তাদের ডাকা হয়, দুঃসময়ে অস্বীকার করা হয়। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ফারুক খান বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামে বাংলাদেশের অধিকাংশ গণতন্ত্রকামী মানুষই কাজ করেছেন, এর জন্য সংগঠন করার প্রয়োজন নেই। যেটার প্রয়োজন পড়েছে, সেগুলোকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। তবে এটাও সত্য, অনেক সংগঠন আমাদের দল, দেশ ও মানুষকে ভালোবাসে। যখনই তারা আমার কাছে এসেছে, আমি বলেছি, আপনারা গঠনতন্ত্র তৈরি করে পার্টি অফিসে সাধারণ সম্পাদকের কাছে জমা দেন। তিনি এটা দেখে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আনবেন। আলোচনার মাধ্যমে আমরা যদি স্বীকৃতি দেই, তখন আপনারা কার্যক্রম শুরু করবেন।’

কিন্তু ব্যত্যয় হয় কেন, এর সমাধান কী? জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের এ নেতা বলেন, ‘এটার সহজ সমাধান আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ, এখানে তো মার্শাল ল’ জারি, ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করতে পারবেন না। কারণ এখানে দু’ধরনের লোক আছে; কিছু আছে সুযোগসন্ধানী; যারা ‘আওয়ামী’ বা ‘লীগ’ যুক্ত করে সংগঠন দিয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা বদনাম করে। আবার কয়েকজন আছেন প্রকৃতার্থেই দল ও দেশকে ভালোবাসে, হয়তো মূল সংগঠনে জায়গা না পেয়ে একটা সংগঠন করেছেন। তাদের কোনো কোনো অনুষ্ঠানে আমাদের কোনো কোনো নেতাও গেছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকী ও বিজয় দিবসসহ নানা দিবস উদযাপন করেন।