অরণ্য, পাহাড়, ঝর্ণা আর হ্রদের শহর রাঙামাটি এখন পর্যটকদের বরণ করে

বর্ষা শেষে আগমন ঘটেছে শরতের মিষ্টিমাখা আমেজ। উঁকি দিচ্ছে শীতও। ধীরে ধীরে কমছে উষ্ণতার তেজ। কখনো কখনো দোলা দিয়ে যাচ্ছে মৃদু মন্দ হিমেল হাওয়া। অরণ্য, পাহাড়, ঝর্ণা আর হ্রদের শহর রাঙামাটি এখন পুরোদমে প্রস’ত পর্যটকদের বরণ করে নেওয়ার।


ভয়াবহ পাহাড় ধসের বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে রাঙামাটির পর্যটন ব্যবসা। মৌসুমের শুরুতেই পর্যটকের আগমন ঘটছে উল্লেখযোগ্য হারে। পর্যটকদের আগমন ঘিরে নিরাপদ ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রস’তি নিয়ে রেখেছে পর্যটন ব্যবসা সংশ্লিষ্টরাও। রাঙামাটি জেলা পরিষদের নেয়া সোয়া ১২০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়াবে পর্যটনের রূপ।
অথচ চলতি বছরের ১৩ জুনের পাহাড় ধসের পর গত প্রায় সাড়ে চার মাস পর্যটন ব্যবসায় মারাত্নক মন্দা দেখা দেয়। রাঙামাটি চেম্বারের হিসাবে, জেলায় পর্যটনের পাঁচটি খাতে দিনে গড়ে অন্তত ৩০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে এসময়। খরচ কমাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। কিন’ সেই ক্ষত এখন শুকোতে শুরু করেছে। চাঙ্গা হতে শুরু করেছে পর্যটন ব্যবসা।
হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশির বুকে ঠিকরে পড়া বৈকালিক রোদের দ্যুতি ছড়ায় চারপাশ। আলো ছায়ার খেলায় মত্ত সাদা মেঘের ভেলা পাহাড়মালার সাথে মাখামাখি আর লুটোপুটিতেই যেনো মাতোয়ারা। আর পূর্ণিমা রাতে মৃদু উত্তেজনায় আঁছড়ে পড়া ঢেউয়ের উপর জোছনার ঝলকানিতে আপ্লুত আপনি অনায়াসেই হারিয়ে যেতে পারেন স্বপ্নের রাজ্যে।
এলোমেলো সারিতে সাজানো উঁচু-নিচু আর ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়ের সমাবেশ। যে দিকে চোখ যায় স্বচ্ছ জলরাশি আর বিস্তীর্ণ সবুজের হাতছানি। সবুজ পাহাড়ের পরতে পরতে রয়েছে অসংখ্য উচ্ছল ঝর্ণাধারা। নৈসর্গিক লীলাভূমি পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি যেন শিল্পীর হাতে আঁকা নিখাঁদ জীবন্ত ছবি! মন হারায় নিমিষেই।
প্রতিনিয়ত হাজার হাজার পর্যটক যান্ত্রিক শহুরে ক্লান্তি দূর করতে ছুটে আসেন রাঙামাটি। বিনোদনের খোঁজে পাহাড়ে আসা পর্যটকদের আনন্দ আর উচ্ছলতা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ভুলিয়ে দিচ্ছে জীবনের নানান জটিলতা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের উপচে ভিড় থাকে। শহরের পর্যটন স্পট ঝুলন্ত সেঁতু, শুভলং ঝর্ণা, পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স, সুখী নীলগঞ্জ এবং রাজবন বিহার এলাকায় প্রতিনিয়ত ভিড় জমান বেড়াতে আসা পর্যটকরা।
রাঙামাটি পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যবস’াপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, গত কয়দিন ধরে পর্যটকের আগমন শুরু হয়েছে। বর্তমানে পর্যটন মোটেলের কক্ষগুলো প্রায় সময় শতভাগ বুকিং থাকছে। ছুটির দিনে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাঙামাটি। ঝুলন্ত সেঁতু এখনও প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। তবুও পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন না। শুক্র-শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনে গড়ে প্রায় সহস্রাধিক পর্যটক আসছেন।
শহরের দোয়েল চত্ত্বরের আবাসিক হোটেল ‘প্রিন্স’ এর মালিক নেছার আহমেদ জানান, পাহাড় ধসের ঘটনায় দীর্ঘ প্রায় ৪ মাস ধরে রাঙামাটি ছিল পর্যটকশূন্য। কিন’ এখন পর্যটক আসা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে হোটেলে পর্যটকদের অগ্রিম বুকিং দেওয়া শুরু করেছেন।
চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মনিরুল ইসলাম ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতি কিছুটা হতাশ ঝুলন্ত সেতুতে উঠতে না পেরে। বলেন, পানি সরে গেলে আবারও আসবেন। বারবার রাঙামাটির সৌন্দর্য দেখতেই তারা ছোটেন অফিস বন্ধ পেলেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষার্থী অপু রায়হান বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার অভাবে পর্যটনের দিক থেকে রাঙামাটি এখনও পিছিয়ে। এখানকার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগালে জাতীয় ও স’ানীয় অর্থনৈতিক অবস’া দ্রুত পরিবর্তন করা যাবে, বলেন তিনি।
রাঙামাটি শহরে বেসরকারি ৪২টি হোটেল-মোটেল রয়েছে। প্রতিদিন তিন হাজার অতিথি হোটেল-মোটেলে থাকতে পারে। পর্যটকদের সেবা দিতে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে চার শতাধিক। হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট (খাবারের দোকান), টেক্সটাইল (পাহাড়িদের তৈরি কাপড়), নৌযান এবং বিনোদন কেন্দ্রকে (ঝুলন্ত সেঁতুসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স’ান) ঘিরেই মূলত রাঙামাটির পর্যটন খাত। রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া পর্যটন ব্যবসায় ক্ষতির পরিমাণ হিসেব কষে বলেন, জরিপ করে দেখেছি, শুধু এই পাঁচ খাতে গড়ে দৈনিক কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
বেসরকারি হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমেদ বলেন, মৌসুমের শুরুতেই পর্যটকদের আগমন ঘটছে, আশা করছি গত চার মাসের লোকসান কমিয়ে আনতে পারবো। শহরের হোটেল সুফিয়া কমপ্লেক্সের ব্যবস’াপক সোহেল হাওলাদার বলেন, পর্যটকেরা অগ্রিম বুকিং দেওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিনই পর্যটকদের উপসি’তি বাড়ছে চোখে পড়ার মতো।
রাঙামাটিতে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘের ঝুলন্ত সেঁতুকে ঘিরেই। তাই পর্যটকেরা প্রথমেই ছুটে যান পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকায়। বছরে প্রায় দুই লাখ দেশি ও বিদেশি পর্যটক সেতুটি দেখতে আসেন। পর্যটন কমপ্লেক্সের অধীন দুটি হোটেল-মোটেল, ছয়টি কটেজ এবং ঝুলন্ত সেঁতু রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলে ৮৬টি কক্ষ রয়েছে।
এছাড়া এখানে নির্দিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করে মিলবে পছন্দের নৌযানও। পর্যটন কমপ্লেক্স নৌযান ঘাটের ব্যবস’াপক রমজান আলী বলেন, পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য ঘাটে স্পিডবোটসহ বিভিন্ন ধরনের ৯৫টি নৌযান রয়েছে। নির্দিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করে এসব নৌযানে ভ্রমণ করতে পারেন পর্যটকেরা।
ইতিমধ্যেই রাঙামাটির পর্যটনকে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব পেয়েই পর্যটন উন্নয়নে সোয়া ১২শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন বলে জানান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা। তিনি বলেন, পাহাড়, হ্রদ আর অসংখ্য ঝর্ণা বেষ্টিত রাঙামাটি দেশের পর্যটন খাতে অত্যন্ত ভালো অবস’ানে রয়েছে। আগামীতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য সেরা স’ান হিসেবে গড়ে তুলতে ঐ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলে আগামী বছর প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে।