Friday, October 12, 2018
Home > বিশেষ প্রতিবেদন > ব্যক্তির দখলে চলে গেছে ফুটপাত

ব্যক্তির দখলে চলে গেছে ফুটপাত

রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ফুটপাত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কতিপয় ব্যক্তির দখলে চলে গেছে। অবৈধভাবে কিছু দখলদার জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা ফুটপাত দখল করে বসে আছে। এদের উচ্ছেদ করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে। অবৈধ দখলদারদের প্রশ্রয় দিলে তারা আরও পেয়ে বসবে এবং দিনদিন এটা আরও বাড়তে থাকবে।’ সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনকল্পে ইউলুপ স্থাপনের লক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ কথাগুলো বলেছেন।

তার কথার সূত্র ধরেই বলতে হয়, রাজধানীবাসীর জন্য কোনো ফুটপাত নেই। ফুটপাতের নামে যা আছে তাকে ফুটপাত না বলে বলা উচিত বাজার। হরেক রকম বাজার। কোথাও বসেছে ফল বিক্রেতা, কোথাও পোশাক বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। পাশাপাশি ফুটপাতের পাশে যে দোকানগুলো থাকে তার আংশিক পণ্য সাজিয়ে রাখা হয় দোকানের সামনে ফুটপাতে। অথচ এই ফুটপাত তৈরি করা হয়েছে জনগণের অর্থে তাদের চলাচলের প্রয়োজনে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো। ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বসিয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব ফুটপাত দখল করে আছে রাজনীতির ব্যানারে থাকা কিছু দখলবাজ। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা আদায় করছে এই দখলকারীরা। সংবাদমাধ্যমে প্রায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন চোখে পড়ে। ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে এই দখলবাজচক্রের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের যোগসাজশ রয়েছে। কোনো প্রমাণ না থাকলেও পুলিশের নৈতিকতার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জনগণ বিশ্বাস করে। তার কারণ ফুটপাত দখল করার মতো এই ধরনের শৃঙ্খলা ও আইন ভঙের ব্যাপারে পুলিশের নীরব ভূমিকা।

ফুটপাত দিয়ে চলাচলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় নারীদের, শিশুদের জন্য রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জনগণের চাপ থাকে বেশি, বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড ও শপিংমল এলাকায়। এই সব এলাকায় ফুটপাত দখলের আধিক্যও থাকে বেশি। সবকিছু মিলে তৈরি হয় একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ। আর এই ধরনের পরিবেশে নারীদের নানারকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, আবার কখনো যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়।

নগরীর যানজট নিরসন সময়সাধ্য ব্যাপার কিন্তু ফুটপাত দখলমুক্ত করা এতটা কঠিন কিছু। আমি মনে করি এটা শুধু সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নেপথ্যের দখলকারীদের ইন্ধনে ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ দেখাবে, হয়ত সংঘাতের চেষ্টা করবে, কিন্তু তা মোকাবেলা করার সাহস ও শক্তি নিয়েই সরকারকে মাঠে নামতে হবে। বৃহত্তর নাগরিকের স্বার্থে ভালো কাজে জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা সরকার পাবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুষ্টিমেয় দখলকারীর কাছে বড় একটি স্বার্থ বিসর্জন হতে পারে না। আমি মনে করি সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তা অসম্ভব কিছু নয়।

কারণ খুব নিকট অতীতে আমরা এ ধরনের কিছু পদক্ষেপ ঢাকা সিটি করপোরেশনকে নিতে দেখেছি। প্রথমে তেজগাঁওয়ে রাস্তা দখল করা ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ, কল্যাণপুর থেকে গাবতলীর সড়ক দখল করা বাসস্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং নগরীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলিস্তানের রাস্তা হকারমুক্ত করার প্রয়াস। এই সব কটি উচ্ছেদ অভিযান স্বাভাবিকভাবে হয়নি। বিভিন্ন আশ্বাস কিংবা আইনের যথাযথ প্রয়োগ কাজে লাগিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করতে হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ঠিক এই ধরনের আরেকটি উদ্যোগ নগরবাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। নগরীকে অসুন্দর করে রাখা অননুমোদিত বিলবোর্ডগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই বিলবোর্ড বাণিজ্যেও রয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা আর দখলদারির পেশিশক্তি প্রদর্শন। সবকিছুকে উপেক্ষা করে আইন এবং নাগরিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানাই। সে জন্যই বলছি, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে ফুটপাত দখলমুক্ত করে নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচলকে নির্বিঘœ করা কঠিন কিছু নয়।

লেখক : আইনজীবী ও নির্বাহী পরিচালক, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সপ্ন’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: